আজ ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

অনিয়মের অভিযোগে বহিস্কার প্রধান শিক্ষক সভাপতির বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক ——

বেলাব উপজেলার দক্ষিনধুরু উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহেরকে নানা অনিয়মের অভিযোগে পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে করা হয়েছে সাময়িক বরখাস্ত।

অন্যদিকে পরিচালনা কমিটির সভাপতি আবু কালামের বিরুদ্ধেও সাময়িক বহিস্কৃত প্রধান শিক্ষক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে করেছেন অনিয়মের লিখিত অভিযোগ।

বেলাব সহকারী কমিশনার(ভূমি) মোঃ নাজমুল হাসান ভূইয়া উক্ত অভিযোগের তদন্ত করছেন।

এদিকে প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ তদন্তকালীন সময়ের মধ্যেই চলতি মাসের ১১ তারিখে বিদ্যালয়ের ১৫ জন শিক্ষক কর্মচারী অর্থ আত্মসাৎ,দুর্নীতি, অনিয়ম,স্বেচ্ছাচারী ও অশিক্ষক সুলভ আচরনের অভিযোগ এনে উক্ত প্রধান শিক্ষককে লিখিত ভাবে অনাস্থা দিয়েছেন।

এর একদিন পর ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের ম্যানিজেং কমিটি উক্ত শিক্ষককে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে করেন সাময়িক বরখাস্ত।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির মধ্যে দ্বন্ধ শুরু হয় একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে নিয়ে।

চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারী অত্র বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণীর ৪ জন কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় ১৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য হয় ৪জন। এই ৪ জনকে নিয়োগ দিতে প্রধান শিক্ষক বারবার সভাপতিকে নিয়োগ পত্রে স্বাক্ষর দিতে অনুরোধ করলেও সভাপতি অনিয়ম হয়েছে এমন ইঙ্গিত পেয়ে স্বাক্ষর দেয়া থেকে বিরত থাকেন।

এদিকে নিয়োগ পরীক্ষার ১২ দিন পর পরীক্ষা অংশগ্রহণ করা ও অকৃতকার্য হওয়া বাকি ১২ পরীক্ষার্থী পরীক্ষার অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ করে পূর্ণরায় নিয়োগ পরীক্ষা নেয়ার জন্য সভাপতির কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

ফলে পরিচালনা কমিটি সভা করে উক্ত নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে।

অভিযোগ রয়েছে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক আলাদা আলাদা ভাবে তাদের স্ব স্ব পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে না পারায় শুরু হয় তাদের মধ্যে দ্বন্ধ।

এসব দ্বন্ধ নিরশনে ম্যানেজিং কমিটি ও অভিভাবক ও এলাকাবাসি করেছেন একাধিক গ্রাম্য সালিশ।

জানা গেছে,নতুন কমিটি গঠনের পর চলতি বছরের ১৪ মে তারিখে প্রথম সভা আহবান করে কমিটির সদস্য সচিব ও প্রধান শিক্ষক আবু তাহের। কিন্তু তিনি সভা আহবার করে নিজেই উপস্থিত থাকেননা। এমনকি রেজুলেশান খাতা তার বাড়িতে নিয়ে যায়। এসময় সভায় আসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সিদ্বান্তে নতুন খাতা ক্রয় করে সভার রেজুলেশান করেন সভাপতি। পরে তিন মাসের মধ্যে একাধিকবার সভা আহবান করা হলেও প্রধান শিক্ষক নানা অজুহাতে উক্ত সভায় অনুপস্থিত থাকেন এবং কমিটিকে নানা ভাবে অসহযোগীতা করে। ফলে বাধ্য হয়েই কমিটির অন্যান্য সদস্যরা সভা করে কুয়াব সদস্য গঠন করে। এরই মধ্যে নতুন কমিটির সাথে প্রধান শিক্ষক নিয়মিতভাবে খারাপ আচরণ,কমিটির নির্দেশ না মানা,অসহযোগীতার পরিমাণ বাড়তে থাকলে বিচার চেয়ে জুন মাসের ২১ তারিখে বেলাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ প্রদান করে কমিটির সভাপতি আবুল কালাম।

সেখানেও উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধেও কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় কমিটি ২৮ জুলাই শিক্ষক ও কমিটির সদস্যদের সাথে অসৌজণ্য মূলক আচরণ,না এসেই হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর,বর্তমান কমিটির কোন সভায় উপস্থিত না হওয়া,বিদ্যালয়ের ল্যাপটপ,মোবাইল সেটসহ বিভিন্ন জিনিস ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা,বিদ্যালয়ের রেজুলেশান ও নোটিশ খাতা বিদ্যালয়ের কাজে ব্যবহার করতে না দেয়া ও বাসায় খাতা নিয়ে যাওয়া,বিদ্যালয়ের ফান্ড থেকে পয়ত্রিশ হাজার টাকা লোন নিয়ে ফেরত না দেয়া,সভাপতির সাথে ব্যাঙ্গাতক ও অশালিন আচরণ করা,নব নির্মিত ভবন হতে বে-আইনী কমিশন নেয়া,শিক্ষকদের হুমকী দেয়া,ঈদুল আযহার শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন বোনাস না দেয়ার অভিযোগে একটি কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করে কমিটি। তিন দিনের মধ্যে কারন দশার্নো নোটিশের জবাব দেয়ার কথা থাকলেও জবাব না দিয়ে বরং আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন প্রধান শিক্ষক আবু তাহের। ফলে ৭ আগষ্ট দেয়া হয় ২য় কারণ দশার্নো নোটিশ। তারও কোন জবাব না পাওয়ায় ২৩ আগষ্টে দেয়া হয় ৩য় কারণ দর্শানো নোটিশ। ৩য় কারন দশানো নোটিশে আগের দুটি কারণ দশার্নো নোটিশের জবাব না দেয়া ও গত তিন বছরের বিদ্যালয়ের আয় ব্যয়ের হিসাব ম্যানেজিং কমিটিকে অবগত না করানো,ব্যয় ভাউচার ক্রয় ও অর্থ কমিটিকে অবগত না করে নিজেই অনুমোদন করা,অভ্যন্তরীন অডিট পরিচালনা না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কেন সাময়িক বরখাস্ত করা হবেনা কারন জানতে চাওয়া হয়।

সেখানেও কোন জবাব না দিয়ে শিক্ষক ও কমিটির লোকদের সাথে উক্ত শিক্ষকের খারাপ আচরণ অব্যহত থাকে।

ফলে চলতি মাসের ১২ তারিখে প্রধান শিক্ষককে করা হয় সাময়িক বরখাস্ত।

এর আগে গত আগষ্ট মাসের ২৩ তারিখে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোঃ আবুল কালাম ভূইয়ার বিরুদ্ধে সভাপতি হবার পর নোটিশ ও রেজুলেশান খাতা কিনে বাসায় বসে কমিটির কিছু সংখ্যক লোকের স্বাক্ষরে রেজুলেশান খাতা লেখা,বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের ঠিকাদারের কাছ থেকে উন্নয়নের জন্য পাওয়া ৭০ হাজার টাকার মধ্যে ১০ হাজার টাকা মাঠি ভরাট করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা,আজীবন দাতা সদস্য হিসাবে এককালীন ১৫ হাজার টাকা জমা না দেয়া,কিছু শিক্ষক নিয়ে গ্রুপিং করা ও বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ করার অভিযোগ এনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। যা বর্তমানে তদন্তনাধীন।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন,প্রধান শিক্ষক স্থানীয় হিসাবে উনি একটু বেশি অসুলভমূলক আচরণ করেন। আমরা উনাকে ভয় পায়। আমরা উনাকে অনাস্থা দিয়েছি।

বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান,প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির দ্বন্ধে পাঠদানেও সৃষ্টি হচ্ছে সমস্যা। আমরা দ্রুত এ সমস্যা সমাধান চাই।

অভিভাবক মোঃ সামসুউদ্দীন ভূইয়া বলেন,সাময়িক বরখাস্ত করার পরও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক স্থানীয় লোক হিসাবে নিজের আধিপত্য বিস্তার,শিক্ষকদের ভয় দেখানো ও পেশী শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যালয়ে বিশৃখলার পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ বাহাউদ্দীন ভূঞা বলেন,আসলে আবু তাহের সাময়িক বহিস্কৃত প্রধান শিক্ষক বর্তমান কমিটিকেই মানেনা। সহকর্মীদের সাথে উনার আচরণগত ক্রুটি আছে। এসব কারনে আমরা অনাস্থা দিয়েছি।

নতুন ভবনের কাজ করা মেসার্স রনি এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী সৈয়দ রনি মীরের সাথে মোবাইলে কথা হলে তিনি জানান,প্রধান শিক্ষক আবু তাহের সম্পূর্ণ বে-আইনী ভাবে আমার কাছ থেকে তিন লক্ষ টাকা উৎখোচ নিয়েছে। যার প্রমান নরসিংদী পোস্টের কাছে রয়েছে।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আবুল কালাম ভূইয়া বলেন,প্রধান শিক্ষককে একাধিক কারন দর্শানো নোটিশ দিয়েছি। যার অনুলিপি দেয়া আছে মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। দুঃখের বিষয় আমাদের অভিযোগের কোন তদন্ত এ পর্যন্ত আসেনি। অথচ মাত্র ২৫ দিনে একটি মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে তদন্ত নিয়ে আসা হয়েছে। কমিটি তাকে বিভিন্ন অনিয়মের কারনে সাময়িক বহিস্কার করেছে অন্যদিকে শিক্ষকরাও তাকে অনাস্থা দিয়েছে।

অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন,সভাপতি নির্বাচিত হবার পর আমার জানামতে তিনি ৩ মাসের মধ্যে কোন সভা করেনি। তিনি বাজার থেকে রেজুলেশান খাতা ক্রয় করে বাড়িতে বসে রেজুলেশান করে। আমি বোর্ডে উনার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করেছি। যা তদন্ত চলমান। বিধি মোতাবেত তদন্ত চলাকালীন সময়ে উনি সাময়িক বরখাস্ত বা অন্য কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনা। কিন্তু তিনি(সভাপতি) অন্যায়ভাবে আমাকে সাময়িক বহিস্কার করেছেন। এসময় তিনি বলেন,আমার অভিযোগের তদন্ত চলছে এব্যাপারে নিউজ না করার অনুরোধ করে ফোন কেটে দেন।

বেলাব উপজেলা সহকারী কমিশনার(ভূমি) মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ভূইয়া জানান,প্রধান শিক্ষক সভাপতির বিরুদ্ধে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ অভিযোগের তদন্ত করছি আমি। তদন্ত করার পর প্রতিবেদন পাঠানো হবে। তবে সভাপতিরও যদি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকে তাহলে তারা যদি সংশ্লিষ্ঠ কর্তপক্ষের কাছে অভিযোগ দেয় আর সে অভিযোগের তদন্ত আমাদের কাছে আসলে আমরা তদন্ত করে দিব।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মতিউর রহমান জানান,প্রধান শিক্ষক কর্তৃক সভাপতির বিরুদ্ধে দেয়া একটি অভিযোগের তদন্ত চলছে বর্তমানে। তবে প্রধান শিক্ষককে কারন দর্শানো নোটিশের তথ্য আমি জানলেও সাময়িক বরখাস্তের ব্যাপারে এখনো আমি অবগত নয়।

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...