আজ ২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

অপবাদ ও অপেক্ষা লেখক- ডাঃ শাকূর মাহমুদ

আজ তিন দিন ধরে অপেক্ষায় আছি
ওনি কেনো আসছেন না!
বিগত বেশ কয়েকদিন যাবৎ ওনাকে দেখেছি-
দরজায় উঁকি দিয়ে চলে যান।
ওনি দরজায় উঁকি দিলেই বুকটা ছটফট করে
আর আমি আনরেস্ট হয়ে হাত- পা ছোড়াছুড়ি করি,
কিছু দিন আগেও আশেপাশের লোকজন আমাকে দুনিয়া নামক কয়েদখানার টর্চার সেল হাসপাতালে নিয়ে যায়।
আমার নিথর দেহ টা হাসপাতালের বেডে পড়ে দিন-ক্ষণ আর অন্তিম মুহূর্তের কথা স্মরণ করে।
মাঝে মাঝে কিছু স্মৃতি আমাকে এই কয়েদখানায় আটকে রাখতে চায়!
আহ্হা! আমার ছেলে-মেয়েদের ছোট্ট কালের কচি কচি মুখ!, প্রথম কান্নার আওয়াজ, তুলতুলে নরম হাত পায়ের স্পর্শ, ‘ বাবা’ ডাক শোনা, হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জাপটে ধরা, পায়ের উপর পা ভর দিয়ে ‘এইন্যা এইন্যা’ করে পথ চলা।
স্কুল থেকে বাপ ছেলেদের রিক্সায় চাপাচাপি করে বাসায় ফেরা, মেয়ের বৃত্তি পাবার খবরে পাড়া জুড়ে মিস্টি খাওয়ানো, ছেলেদের মেট্রিক পাশের পর অফিস জুড়ে কলিগদের উল্লাস আর আমার বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে চলা।
বড় ছেলের ইন্জিনিয়ারিং এ চান্স পাওয়ার আনন্দ, ছোট ছেলের প্রতিষ্ঠিত নিউজ চ্যানেলে চাকরি পাওয়া, মেঝো ছেলে আর একমাত্র মেয়ের সরকারি কলেজে বিসিএস চাকরি, পেনশনের টাকা দিয়ে গড়া প্রথম বাড়িতে সবাই কে নিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ; কী মধুর সব স্মৃতি!
আমার জীবন টা অষ্টম বেহেশত বলে যদি কিছু থাকে সেটা বললে কী ভুল হবে?

তারপরও এই বেহেশত খানায় আমি আর থাকতে চাই না। আমি ওনাকে খুঁজছি!

কোথায় মালাকুল মউত!

আমার বেহেশত খানায় আজ আমি-ই বিরাট অপরাধী। হাসপাতাল থেকে ফিরে আমার পঞ্চান্ন বছরের পুরনো খাটে এই যে শুয়েছি আর নড়ার ক্ষমতা নেই।

আমার ছোট ছেলে পাশের রুম থেকে ওর মা-কে
চিৎকার করে বলে, বাবা আমার জন্য কী করেছে? পুবাইলের জমিটা বড় ভাই আর মেঝ ভাই কে দিয়ে দিয়েছে! এই বেইমানির সাজা বাবা এই পৃথিবীতে না পেলেও ওপারে একদিন ঠিকই পাবে। ওনার তো নীতি ঠিক নাই, তেল মাথায় তেল ঢালেন। বড় ভাই দের কে পুবাইলের জমি আর আমাকে এই অজপাড়া গাঁয়ের বাড়ি?
কিছু ক্ষণ পর বউ পাশে বসে দেখে
বিছানায় আমার নিথর দেহ, চোখের পাতা খোলার ও শক্তি নেই। একমাত্র মেয়ে কে কল করতেই , বাবার তো এমন হবেই।বলেছিলাম আমার কাছে থাকতে। না, ওনি থাকবেন ওনার প্রিয় ছোট ছেলের কাছে। সারা জীবন ছোট টারে করে গেলো। আমি মেয়ে হিসেবে বাবার কাছ থেকে কী পেয়েছি। সম্পত্তির ভাগ তো কখনো চাই নি। বিয়ের সময় একটা সুতা ও তো দেয় নি। বিয়ের পর কোন ঈদে নাঈমের আব্বু তো দূরে থাক আমাকেও কিছু দেয় নি। সারা জীবন বাবা এক চোখে ছেলেদের ই করে গেলো।

মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বউ কাশতে কাশতে বড় ছেলে ইমরান কে কল করে। ইমরান , অবস্থা তো ভালো না, বাড়ি কবে আসবি?

বাবার তো এঅবস্থা অনেক দিন থেকেই। গত সপ্তাহে ও তো গিয়ে দেখে এসেছি। অফিসের অনেক চাপ। মা, বাবা সুস্থ হলে কিন্তু উত্তরের জায়গাটা আমাকে আর মেহেদী কে দিতে বলবা। শেষ বয়সে আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে একটা ঝগড়া বাধিয়ে গেলেন। ছোটটার তো নিয়ত খারাপ। বাড়ির সব কিছু ই হাতিয়ে নিলো। ওনি আজীবন এক চোখে ছোট ছেলেকে দেখে গেলেন।

ফোন কাটতেই মেজ ছেলে রুমে এসে, মা! বাবার অবস্থা কেমন? কিছু খায়? সিগারেট এনে দিলে তো লাফ দিয়ে উঠবে। সারা জীবন যেই পরিমাণ সিগারেট খেয়েছেন এখন তো এমন হবেই। আমাদের কথা জীবনে কোনো দিন কী শুনেছেন? ডানে বললে ওনি বায়ে যান। এখন যদি উনি মারা যান, হ্যাপি তো পরের কথা আমাকে আর বড় ভাই কে – মাসুম বাড়ির ত্রি সীমানায় ঢুকতে দিবে না। সুস্থ থাকতে এতো করে বললাম, আমাদের তিন ভাই বোনকে বাড়ির উত্তর দিক দিয়ে অন্তত তিনটে রুম করার জায়গা দিন। ওনি ‘ ধানাইপানাই, ‘ করে দিমু দিচ্ছি করে আর দিলেন ই না। অথচ আমদের সার্টিফিকেটে তিনজনের ই স্থায়ী ঠিকানা আমাদের এই গ্রামের বাড়ি। বাড়ি করার সময় তো আমরা সবাই টাকা দিয়েছি। অথচ এখন বাড়ির মালিক মাসুম। আমরা তো আর বাড়ির ভাগ চাই নি, এক টুকরো করে জমি চেয়েছি। বাবা, আসলেই অবিবেচক।

আসলেই আমি অবিবেচক! কারণ আমি বাবা!
আমি অবিবেচক হয়েও চারটি সন্তান মানুষ করেছি। আমি ছিলাম কৃষকের ঘরের সন্তান। আমার বাবা- মা ছিলেন নিরক্ষর। বাবার সাথে হাল চাষ করতাম আর সাড়ে সাত মাইল হেঁটে স্কুল যেতাম। একটু বড় হয়ে বাজার বাজার ঘুরে পান- সিগারেট বিক্রি করেছি, কখনো লজিং থেকে পরীক্ষা দিয়েছি। মেট্রিক, ইন্টার পাশের পর স্কুলে মাস্টারি করেছি আর স্কুলের ফাঁকে ফাঁকে সাব কন্ট্রাক্টারির টাকা দিয়ে পুবাইলের একখন্ড জমি কিনেছি। ওই জমিটা অনেক কষ্ট করে কিনেছি আর জীবনের বাকী সময় যা কামিয়েছি অধিকাংশ ই পৈতৃক বন্ধকী জমি ছুটিয়েছি। ছয়ভাই এর ভাগে পৈতৃক সম্পত্তি ভাগের পর আমার অংশে যেটুকু পড়েছে সবটুকুই তোমাদের। মালাকুল মউত আমাকে সঙ্গী করে নিয়ে গেলে আমি তো আর এসব নিয়ে যেতে পারবো না।
আমি একচোখা কারণ আমি আমার চোখ দিয়ে শুধু সন্তানদের ভবিষ্যৎ দেখেছি। তোমাদের ভরণপোষণ আর পড়াশোনার খরচ যোগাতে কলুর বলদের মতো দিন- রাত খেটে গিয়েছি। রুটি বানাতে বেশি আটা খরচ হবে ভেবে আমি আর তোমাদের মা আটার জাউ খেয়ে থেকেছি মাসের পর মাস। সিগারেটের আগুন লেগে ছিদ্র হয়ে যাওয়া শার্ট পরে কাটিয়েছি অন্তত দু বছর। প্রতিদিন দশ- দশ করে বিশ টাকা বাঁচানোর জন্য অফিস গিয়েছি পায়ে হেঁটে। বাজারের ব্যাগ কখনো তোমাদের হাতে দিয়েছি বলে মনে করতে পারছি না। তোমাদের আবদার যেদিন না মেটাতে পারতাম, সেদিন অনেক রাত করে বাড়ি ফিরতাম । তারপরও দেখতাম দু- একজন সজাগ। তখন নির্জলা মিথ্যা বলা ছাড়া উপায় থাকতো না।

ইমরান যখন হলো তখন আমি মাস্টারি করতাম। অনেক কষ্ট হতো। যৌথ পরিবার টানতে টানতে আমার প্রায়শই দিশেহারা অবস্থা । ও ছোটকালে একটা খেলনা পছন্দ করেছিলো। অনেক দাম তবু্ও আমি ওই খেলনা ওকে কিনে দিয়েছিলাম। কীভাবে দিয়েছি আজ মনে পড়ছে, আমার রক্তের গ্রুপ এ নেগেটিভ। রক্ত বিক্রি করে এনেছি, ওর খুশি দেখে শরীরের দুর্বলতা কেটে গিয়েছিলো। তোমরা চার ভাই – বোন একই সাথে পড়াশোনা করছিলে আর আমি রাত দেড়টা পর্যন্ত অফিস টাইমের বাইরে কাজ করতে ব্যস্ত। টানা চার বছর কোনো নতুন লুঙ্গি নেই নি, শার্ট কেনা হয় নি, বারবার জুতা শেলাই করে পড়তে হয়েছে। যখন মেহেদী হলো আমার তখন বড় একটি চাকরি হলো কিন্তু যখন শুনলাম ও খুব অসুস্থ তখন ট্রেনিং ছেড়েই চলে আসি ছেলেকে বাচাতে। ওর কান্না বন্ধ রাখতে সারা রাত কোলে নিয়ে বসে থাকতাম। চোখের পাতা লেগে গেলেই ও খুব কান্না করতো তাই টানা অনেক রাত অ ঘুমন্ত কাটিয়েছি। হ্যাপি হবার পর আমার নতুন চাকরি হলো পরিবার তখন কিছু টা স্বচ্ছল। হ্যাপিকে তোমরা দুই ভাই আগলে রেখে স্কুলে যেতা। ছোটবেলায় হ্যাপি একবার হারিয়ে গিয়েছিলো আমি তখন পাগলপ্রায়, বোনের জন্য তোমাদের হাহাকার আর কান্না পাড়ার সবার মন ছুঁয়ে ছিলো তখন। ওকে কখনো ভালো ড্রেস হয়তো কিনে দিতে পারি নি। কিন্তু শীতকালে আমার গায়ের চাদর দিয়ে ওকে ঢেকে রাখতাম। আমার মেয়ে, আমার মা। এখনকার সময়ের মতো ওই সময় কোনো এসি ছিলো না, ইলেক্ট্রিসিটি র ও বেহাল দশা ছিলো। একরুমে মোমবাতি হারিকেন জ্বালিয়ে তোরা লেখাপড়া করতে, আর তোমাদের এই স্বার্থপর বাবা তোমাদের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে সারাক্ষণ হাত বদল করে করে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতো। অনেক সময় রাতেও কারেন্ট থাকতো না। সারাদিন অফিস শেষ করে নিজের ক্লান্তি ভুলে গিয়ে নিজই বাতাস সাপ্লাই এর কারখানা হতাম। ছোট মাসুমটা যখন হলো তখন তেমন অভাব ছিলো না। ওকে তোমরাও অনেক আগলে রাখতে। তোমাদের ছোটবেলার মিল দেখে আমি মনে মনে ভাবতাম আমার আর বেহেশতের দরকার নাই।
যখন মাসুম কে মিথ্যা মামলায় জেলে নিয়ে গেলো প্রতি সপ্তাহে আমি আর তোমাদের মা ওকে দেখতে কাশিমপুর কারাগারে যেতাম। আমরা দু জন বয়স্ক মানুষ তিন তিন বার বাস পাল্টে চোর ডাকাত, ঝড় বৃষ্টি, মানুষের ধাক্কা উপেক্ষা করে ওকে দেখতে যেতাম। ওর কাঁদো কাঁদো চোখে আমতা আমতা করে কথা বলা আমার হৃদয় ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যেতো। জেলের ভেতর কত কায়দা করে টাকা পাঠিয়েছি, খাবার পাঠিয়েছি, ফলমূল পাঠিয়েছি। আমার আয় সীমিত ছিলো মানতে অস্বীকার করি না। যেই ছয় মাস ও জেলে ছিলো আমি আর তোদের মা ডালের পানি আর শুধু ভাত খেয়ে থেকেছি। কই কখনো তো অন্য ছেলেদের কাছে হাত পাতি নি। আমি বাবা, হলেও আমার ও আত্মসম্মান আছে। কোনো ছেলেমেয়ে কেই আমি বৈষম্য করে দেখি নি। হয়তো তোদের চোখে বৈষম্য।

আমি তোদের সবাইকে ই অফিস থেকে এসে চুমু খেয়েছি, কোলে নিয়েছি। তোদের সবার পাতে খাবার না তুলে দিয়ে খাবার খাই নি। সবাইকে কাঁথা দিয়ে না ঢেকে আমার শরীরে কাঁথা দেই নি। ছোটকালে কোনো ঈদে তোরা কী আমার গায়ে নতুন কোনো জামা দেখেছিস? তোরা সবাই একসাথে থাকবি বলেই গ্রামের বাড়িতে পেনশনের সব টাকা দিয়ে বাড়ি করেছি। কিন্তু সময় একটা কঠিন বাস্তব জিনিস। তোরা কেউ ই একসাথে থাকতে চাস না। সবাই আলাদা। কিন্তু বাবারা, আমি তো তোদের সবাইকে একসাথে দেখতে চাই। তোদের কে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে বন্ধু- বান্ধব ছেড়ে দিয়েছি, আমার সব শখ আহ্লাদ জলাঞ্জলি দিয়েছি। তোদের চিকিৎসায় কখনো কোনো ঘাটতি রাখিনি। আমি পেটের পীড়ায় দিনের পর দিন ভুগেছি, ঠান্ডা পানিতে গামছা ভিজিয়ে পেটে বেধে জ্বালা কমানোর চেষ্টা করেছি। তবু তোদের ওষুধ সময় মতো ঠিক ই কিনেছি।
আজ এই ধন সম্পদ আমি তো নিয়ে যাচ্ছি না। সব তোদের জন্য রেখে যাচ্ছি। আজকে এসবের জন্য আমি তোদের চোখে একচোখা, অবিবেচক, অকেজো এক বস্তু। মনে রাখিস আমি কৃষকের ছেলে হয়ে এতো কিছু করেছি, তোদের প্রতিষ্ঠিত করেছি। তোরা কিন্তু চাকরিজীবী র ছেলে। আমি জীবদ্দশায় যা করেছি তার দশ গুন বেশি করার কথা। তোদের ছেলেমেয়েদের ও তোদের কাছে প্রত্যাশা আরও অনেক বেশি থাকবে।
তোদের কাছে আমার অনুরোধ শেষ বয়সে তোরা কিন্তু আমার মতো এ রকম এক চোখা, অবিবেচক হয়ে অন্তিম মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করিস না।
আমি প্রতিটি সন্তান কেই একই রকম হৃদয় অনুভূতি দিয়ে চুমু খেয়েছি, বুকে আগলে রেখেছি, পিঠে চড়িয়েছি। পৃথিবীতে কোনো সন্তান কী তার বাবার একটি চুমুর তিল পরিমাণ মূল্য তার বাবকে ফেরত দিতে পারবে?

যাক এতক্ষণে দরজায়া ঠক ঠক আওয়াজ এসেছে। কেউ শুনতে পাচ্ছে না। কিন্তু আমি ঠিক ই পাচ্ছি।

– ওয়া আলাইকুমুস সালাম
– লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ)

( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিওন)

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...