আজ ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৬শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

একাধিক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক জেনে ক্ষোভে স্বামীকে হত্যা করেন সাবেক স্ত্রী

ঢাকা প্রতিবেদক——

একাধিক নারীর সঙ্গে সাবেক স্বামী জাকির হোসেন বাচ্চুর প্রেমের সম্পর্ক আছে জানতে পেরেই সাবেক স্ত্রী আরজু বেগম হত্যা করেন স্বামীকে। পিবিআই ঢাকা ইউনিটের কাছে ধরা পরার পর আরজু বেগম সাবেক স্বামী জাকির হোসেন বাচ্চুকে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

জানা যায়,জাকির হোসেন বাচ্চু জিনের বাদশা হিসাবে পরিচিত। সেই সুবাধে দুই বছর আগে ‘জিনের বাদশা’ পরিচয়ে আরজু আক্তারকে ফোন করেন বাচ্চু। শুরু হয় মোবাইলে দুজনের কথোপকথন। এক পর্যায়ে মোবাইলে কথা বলার মাত্রা বেড়ে যায় বাচ্চু আর আরজুর। এরই ফাকে জিনের বাদশার সাথে গড়ে উঠে আরজুর গভীর প্রেমের সম্পর্ক।

একসময় তারা বিয়েও করে ফেলেন। বিয়ের পর আরজু জিনের বাদশার স্ত্রী হিসাবে বাচ্চুর প্রতারণার সঙ্গী হয়।

তবে প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া অর্থ অনৈতিক কাজে ব্যয় করা নিয়ে স্বামী বাচ্চু ও স্ত্রী আরজুর মধ্যে দিন দিন সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে।

ফলে গত পাঁচ মাস আগে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। তবে আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হলেও দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল আগের মতোই।

সম্প্রতি আরজু বুঝতে পারেন, একাধিক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন তার সাবেক স্বামী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ভয়ংকর পরিকল্পনা করে বসে আরজু।

একসঙ্গে বাড়িতে যাওয়ার নাম করে প্রথমে লঞ্চের কেবিনে অন্তরঙ্গ সময় কাটান।

এরপর দুধের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তাকে খাওয়ান।

শেষে স্বামী বাচ্চুর হাত-পা বেঁধে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ লুকিয়ে রাখেন খাটের নিচে।

ঢাকা থেকে ভোলাগামী গ্রীনলাইন-৩ লঞ্চের কেবিন থেকে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনার তদন্তে নেমে এসব তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকা জেলা ইউনিট।

হত্যায় জড়িত আরজুকে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সাভারের নবীনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআই প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এতে পিবিআই ঢাকা জেলা ইউনিটের ইনচার্জ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, বাচ্চু হত্যার ঘটনায় তার প্রথম স্ত্রী সুরমা আক্তার বাদী হয়ে গত ৩১ জুলাই দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন, বাচ্চু ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে দ্বিতীয় বিয়ে করেন।

এরপর তিনি কিছুদিন দ্বিতীয় স্ত্রী আরজুর সঙ্গে থাকেন। পরে তাদের বিচ্ছেদ হয়। গত ২৯ জুলাই সকাল ৭টার দিকে তিনি লঞ্চে বাড়িতে আসবেন বলে জানান।

সেদিন স্বামীর ফোনে একাধিকবার কল দিয়ে তা বন্ধ পান সুরমা। এতে সন্দেহ হলে তিনি বিষয়টি আত্মীয়-স্বজনকে জানান। সবাই খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সদরঘাট নৌ থানার মাধ্যমে সংবাদ পান, লঞ্চের কেবিনে খাটের নিচে তার লাশ পাওয়া গেছে।

লঞ্চের স্টাফদের মাধ্যমে জানতে পারেন, কেবিনে তার সঙ্গে কফি কালারের বোরকা পরা একটি মেয়ে ছিল। মৃত্যুর পর তাকে আর কোথাও দেখা যায়নি।

মামলাটি পিবিআইর সিডিউলভুক্ত হওয়ায় পিবিআই ঢাকা জেলা স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহন করে। এরপর পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি বনজ কুমার মজুমদারের তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আনোয়ার হোসেন।

তিনি জানান, বিয়ের পর বাচ্চু তার দ্বিতীয় স্ত্রী আরজুকেও জিনের বাদশা সেজে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করেন এবং তাকেও এ কাজে পারদর্শী করে তোলেন।

এরমধ্যেই তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। জীনের বাদশা পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বাচ্চু যে অর্থ পেতেন তা ব্যয় করতেন অনৈতিক কাজে। এসব নিয়ে মতবিরোধের জের ধরে তাদের বিচ্ছেদ হয়। তবে তালাক দেওয়ার পরও বাচ্চু তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখেন।

এ পর্যায়ে একাধিক নারীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি আরজুর কাছে ধরা পরে। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে সুযোগ খুঁজতে থাকেন। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন রাতেও বাচ্চু তার এক পরকীয়া প্রেমিকার সঙ্গে রাত কাটান। এরপরই আরজু তার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।

তিনি জানতে পারেন বাচ্চু গ্রামের বাড়ি ভোলায় যাবেন। একই এলাকায় দু’জনের বাড়ি হওয়ায় তিনিও সঙ্গে যেতে চান।

এরপর বাচ্চু লঞ্চের একটি স্টাফ কেবিন ভাড়া করে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওঠেন। কেবিন ভাড়া নেওয়ার সময় লঞ্চ কর্তৃপক্ষ তাদের কোনো তথ্য রাখেনি।

লঞ্চে ওঠা থেকে নামা পর্যন্ত আরজুর বোরকা পরে ও মুখ ঢেকে ছিলেন।

আরজুকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে তারা সদরঘাট থেকে ভোলার ইলিশা যাওয়ার জন্য লঞ্চে ওঠেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আরজু দুধের সঙ্গে পাঁচটি ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে নেন। লঞ্চের কেবিনে অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর পর সেই দুধ বাচ্চুকে খাওয়ানো হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে ওড়না দিয়ে তার হাত-পা বেঁধে অন্য একটি ওড়না দিয়ে তার শ্বাসরোধ করেন আরজু।

পরে লাশ কেবিনের স্টিলের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন। লঞ্চটি ভোলার ইলিশা ঘাটে পৌঁছালে তিনি নেমে যান।

সেদিন দুপুর আড়াইটায় লঞ্চটি ইলিশা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। লঞ্চের স্টাফরা কেবিনটি তিন বাচ্চাসহ দুই নারীকে ভাড়া দেন। লঞ্চটি ঘাট ছেড়ে আসার প্রায় দুই ঘণ্টা পর একটি বাচ্চা খাটের নিচে ঢুকে পড়ে। তখন নারীদের একজন বাচ্চাটিকে বের করে আনতে গিয়ে লাশ দেখে চিৎকার শুরু করেন।

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...