আজ ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৫শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

খরচ বাড়ছে আয় আছে আগের মতই খেয়ে না খেয়ে কোনরকম বেঁচে আছি

শেখ আব্দুল জলিল
রিনা আক্তার। অভাব অনটনের সংসারের গ্নানি টানতে স্বামীর সাথে চা বানিয়ে বিক্রি করেন স্থানীয় দুলালকান্দি বাজারে। ৩ মেয়ে স্বামী স্ত্রী আর শশুর শাশুড়ি মিলে ৭ জনের ভরণ পোষন করেন রিনা অলেক দম্পত্তি। এই দম্পত্তি বলেন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়ত। অভাব ও দারিদ্রের কষাঘাতে আমাদের জীবন এখন দূর্বিসহ। বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়েছে দিগুন। কিন্তু আমাদের চা বিক্রি করতে হয় আগের ৫ টাকা দামেই।

কয়লা আগে ছিল ৬ টাকা কেজি এখন বেড়ে হয়েছে ১৫ টাকা,চিনি আগে ছিল ৬০ টাকা কেজি এখন বেড়ে হয়েছে ১০৫ টাকা ,চা পাতির আগের দাম ছিল ৩শ টাকা কেজি এখন বেড়ে হয়েছে ৪শ টাকা,আদার দাম ছিল আগে ৮০ টাকা কেজি এখন তা দিগুন বেড়ে হয়েছে ১৬০ টাকা। চা বানাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব উপকরনের সবগুলোর দাম বাড়ায় ব্যবসায়ও গুনতে হচ্ছে লোকশান। আগের মত আর বিক্রি হয়না। সংসার নিয়ে পড়েছি মহা বিপদে। খেয়ে না খেয়ে কোনরকম বেঁচে আছি।

রিনার স্বামী অলেক মিয়া। তিনিও স্ত্রীর সাথে ছোট টং ঘরে চা বানিয়ে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি নরসিংদী পোস্টকে জানান,দ্রব্যমূল্যের দাম এতই বেড়েছে যে,সংসার চালাতেই হিমসিম খাচ্ছি এখন। সন্তান স্ত্রী মা বাবাদের স্বাদ আহলাদ পূরণ করতে পারিনা। আগে মাসে আয় হতো ৫-৬ হাজার টাকা। এখন আর আগের মত আয় হয়না। বর্তমানে ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। চা বিস্কুট পান সিগারেট বিক্রি করে যে টাকা পাই সেই টাকা থেকে সপ্তাহে কিস্তি দেই দেড় হাজার টাকা,স্ত্রীর কিডনীতে হয়েছে পাথর,হাতেও টিউমার। টাকার অভাবে এমনিতে চিকিৎসা করাতে পারছিনা। প্রতিদিন লাগে প্রায় দুইশ টাকার ঔষধ। প্রায় তিন মাস আগে পোল্ট্রির মুরগী কিনেছিলাম,মাংস বলতে সেটাই খেয়েছি। ভাল মাছ কিনে খাব সেটাতো ভাবনারও অতিত। বাজারে সব পূণ্যের দাম আকাশ ছোঁয়া,সে তুলনায় আমার দৈনিক আয় বাড়েনি। অন্ধকার দেখছি ভাই। কিভাবে বেঁচে থাকবো একমাত্র আল্লাহপাকই ভাল জানেন।

আমলাব বাজারে নাইট গার্ডের চাকরী করেন জগত মিয়া। পরিবারের সদস্য ৬ জন। এই ৬ জনের ভরণপাষন করতে হয় জগদ মিয়াকেই। এক মেয়ে নরসিংদী কলেজে পলিটেকনিক্যালে পড়ে আরেক ছেলে দশম শ্রেণীতে। জগত মিয়া জানান,নাইট গার্ডের চাকরী করে বেতন পাই ৮ হাজা টাকা,বাজার থেকে কিছু ব্যবসায়ী বকশিস দেয় মাসে ১ হাজার টাকা,আমার দুই ভাই ও এলাকার কিছু লোক প্রতি মাসেই আমাকে ৩/৪ হাজার টাকা দিয়ে সহযোগীতা করে। খুব কষ্টে চলে ভাই আমার জীবন। দিনে সূর্যের আলোতে গেলে চোখে বড় ধরনের সমস্যা হয় একারনে রাতে নাইট ডিউটির চাকরী করি। জগত মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,একটি পুরাতন টিনের ঘরেই ছেলে মেয়ে স্বামী স্ত্রী একসাথে বসবাস করেন। টাকার অভাবে ছেলে মেয়ে উপযুক্ত হলেও আলাদা কোন ঘর তৈরী করতে পারেনা। চোখেন সমস্যা থাকায় গত ৪ মাস আগে আশা এনজিও হতে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তুলে চোখের চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি। জগত মিয়া জানান,পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে আছি। গরুর মাংস খেয়েছেন কতদিন আগে জানতে চাইলে চোখের কোনে একফুটা জ্বল ছেড়ে দিয়ে জগত মিয়া বলেন,ভাই স্ত্রী সন্তান মা বাবাকে ভাল কিছু খ্ওায়াতে পারিনা। গত কুরবানী ঈদে মানুষের দেয়া কিছু মাংস পেয়েছি। তারপর আর মাংস কিনতে পারিনি। মাছ বলতে মাসে ২/৩ বার হয় পাঙ্গাস না হয় কমদামী ছোট মাছ আনতে পারি। ভাল কাপড় নিজেও পড়তে পারিনা স্ত্রী সন্তানদেরও দিতে পারিনা। নাইট গার্ডের বেতন,সাহায্য সহযোগীতা মিলে মাসে আমি পাই ১২-১৩ হাজার টাকা। এর সবটাই চলে যায় সংসারের ভরণ পোষনে। ছেলে মেয়ের লেখা পড়ার খরচে চলে যায় ৫ হাজার টাকা,কিস্তি চলে যায় দেড় হাজার টাকা বাকী ৬ হাজার ৫শ টাকা দিয়ে সংসারের খরচ,ঔষধপত্র কিনতে খুব কষ্ট হয় আমার। জিনিসপত্রের দাম আগে কম থাকায় মোটামোটি ভাবে সংসার চালাতে পারতাম। এখন জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। আমার বেতন বাড়েনি। এই কম টাকায় সংসার চালানো কত যে কষ্ট সেটা একমাত্র আমার মত গরীবরাই বলতে পারবে।

দুলালকান্দি বাজারের খুচরা সবজি বিক্রিতা মিষ্টার মিয়া,তিনি জানান সব সবজির দাম বেড়েছে। টমেটোর দাম আগে ছিল কেজি ৫০ টাকা এখন হয়েছে ১০০ টাকা,কাঁচা মরিচ আগে ছিল ৫০ টাকা কেজি এখন হয়েছে ১১০ টাকা কেজি,আলু আগে ছিল ২০ টাকা কেজি এখন হয়েছে ৩০ টাকা কেজি। তিনি বলেন,আমরাও এসব সবজি পাইকারী কিনে থাকি চড়া দামে। দাম চড়া হওয়ায় বেঁচাকেনাও পড়েছে ভাটা। বেঁচাকেনা ভাটা পড়ায় লাভও হয় কম। এদিকে সংসার চালাতে চাল ডাল তেল সাবান চিনিসহ সব পণ্যের দাম বাড়ছে হু হু করে। সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমাদের মত গরীবদের মরা ছাড়া উপায় থাকবেনা ।

কলেজ ছাত্র আরিফুল ইসলাম বলেন,বতমানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে। এতে সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা নিয়মিত ভাবে বাজার মনিটরিং না করায় কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দ্রব্যমূল্যে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে বলে আমাদের ধারনা। বাজার মনিটরিং ও সুপারভিশনের উপর গুরুত্ব দিতে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান শিক্ষার্থী আরিফ।

নারায়নপুর রাবেয়া মহাবিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্বপন চন্দ্র দেবনাথ বলেন,মানুষের দিন দিন আয় কমতেছে,কাজ কমতেছে। আয় কমার কারনে যে টাকা দিয়ে পণ্য ক্রয় করার কথা সেটা ক্রয় করতে পারছেনা। এটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে মুদ্রাস্ফিতি। তাছাড়া সঠিক সময়ে বাজার মনিটরিং হচ্ছেনা। জিনিসপত্রে দাম সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। শুধু একটা পক্ষ বাজার নিয়ন্ত্রন করছে। তিনি বলেন নাম মাত্রে বাজার মনিটরিং না করে নিয়মিত মনিটরিং করলে হয়তো দ্রব্যমূল্যের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রনের ভিতরে আনা যাবে।

 

 

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...