আজ ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৬শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

জনি খুঁজছে তার মা-বাবাকে!

আশরাফুল হক, লালমনিরহাট।

মানুষের বাস্তব জীবনের গল্প, আর কাল্পনিক কিছু গল্পের অংশ-বিশেষ আমরা দেখি বিভিন্ন সিনেমায়। তবে জনির জীবনের গল্পটা একেবারেই ভিন্ন। তার বাস্তব জীবনের এ গল্পে সৃষ্টিকর্তার নির্ধারণ করা চরিত্রে অভিনয় করতে করতে পাণ্ডুলিপির আগের পাতাগুলোয় কি লেখা ছিলো তা জানার বড় সাধ হয় এখন তার।

বলছি-লালমনিরহাট শহরের বিডিআর হাটখোলা পাঁচ পীর মাজারের পাশের চা-বিস্কুটের দোকানী মোছাঃ জনি বেগমের (৩৪) কথা। তিনি খোচাবারি এলাকার অটো চালক আমির হোসেনের (৩৮) স্ত্রী।

জনি ছোটবেলায় হারিয়ে যায় তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে।
জনির আবছা-আবছা মনে পরে, আর যে মা তাকে লালন-পালন করেছেন তার ভালো করেই মনে আছে যে, এক বৃদ্ধার হাত ধরে ৪/৫ বছরের জনি লালমনিরহাটে এসেছেন, সে বলেছিলো তাকে ঢাকার কমলাপুর/রংপুর রেল স্টেশন থেকে পাওয়া গেছে। নাটকিয় ভাবে কোন এক মহিলা ওই বৃদ্ধাকে বলেছিলো বাচ্চাটাকে একটু দেখবেন, পরে সে মহিলা আর ফিরে আসেনি। জনির বয়স তখন মাত্র ৪/৫ বছর। আবছা-আবছা মনে পরে গরম কালে ফ্রগ পড়ে মায়ের সাথে কোথাও যেন বেড়াতে যাচ্ছিলেন হয়তো। ফেলে যাওয়া মহিলাটি কে তা স্পষ্ঠ মনে নেই জনির। কয়েক ঘন্টা পড়ে জনিকে ফেলে যাওয়া মহিলা না আসায় ট্রেন ফেল করেন ওই বৃূদ্ধা যিনি জনিকে কমলাপুর শ্টেশন/রংপুর স্টেশন থেকে লালমনিরহাটে নিয়ে আসেন। বর্তমানে ওই মহিলা বেঁচে নেই, যিনি জনিকে এনেছিলেন।

সেই বৃদ্ধার পাশে জনিকে কাঁদতে দেখে স্টেশনে দায়িত্বে থাকা পুলিশেরা ওই বৃদ্ধার কাছে বিস্তারিত শুনে তার হাতে ২০০শত টাকা দিয়ে বলেছিলো আপনি বাচ্চাটাকে নিয়ে যান। অন্য কাউকে দিয়ে দেবেন, যাদের বাচ্চা হয়না, এমন কাউকে।

এখান থেকেই শুরু হয় জনির জীবনের ছন্দপতন। ওই বৃদ্ধা (বুড়িমার) ছিলো অভাব অনটনের সংসার। জনিকে কিভাবে লালন-পালন করবেন ভাবনা তখন বুড়ি-মার।

ছোট জনিকে এনে প্রথমে দায়িত্ব নেয় লালমনিরহাট শহরের খোঁচাবাড়ি মাস্টার পড়ার ফয়জার হোসেন (৬০) নামের এক ব্যক্তি। সেখানে বেশি দিন থাকতে পারেনি ছোট জনি। বাঁদরামো করতো-গাছের ডালে-ডালে আর ঘুরে ফিরে কবরস্থানেই গিয়ে খেলাধুলা করতো, তাই তারা আবারো জনিকে নিয়ে আশে ওই বুড়িমা এবং তারি ছেলে আজিজার ও ছেলের বৌ রুবিনা জনিকে লালন-পালন করার ইচ্ছা পোষণ করেন। সেখানে মাস তিনেক থাকার পর স্হানীয় বিডিআর হাট পাঁচ পীরের মাজারের খাদেম, আলী আকবরের স্ত্রী হাসিনা বেগম (৬৫) জানতে পারেন প্রতিবেশী আজিজার ও রুবিনা দম্পতির ঘরে একটি মেয়ে আছে যা কিনা স্টেশনে কুড়িয়ে পাওয়া গেছে।

সে সময় ওই এলাকায় জনিকে নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তাই ওই মাজারের খাদেমের অনুমতি নিয়ে শিশু জনিকে দেখতে যান খাদেমের স্ত্রী হাসিনা বেগম।

সেখানে গিয়ে দেখেন, শিশু জনি খেতে বসেছে। আজকের বৃদ্ধা হাসিনা বেওয়া তখন মধ্যবয়স্ক নারী। তাকে দেখা মাত্রই জড়িয়ে ধরেন জনি। কি যে দেখেছিলেন তার মাঝে তা আজও বলতে পারেননা কুড়িয়ে পাওয়া জনি। তবে অনেক শক্ত করেই ধরেছিল তাকে। অনেকে ছাড়াবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলো। বাধ্য হয়ে একটি পালিত কন্যা থাকা সত্যেও বাড়িতে নিয়ে আসেন জনিকে। স্বামি মাজারের খাদেমের কাছে আকুতির ছলে বলতে থাকেন, “বাচ্চাটা ছাড়লোনা আমাকে। ওকে কিন্তু একেবারেই নিয়ে এসেছি। অনেক কান্না করেছিলো জনি। আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না থামায় সে, তাই নিয়ে এলাম, তুমি কি বলো? বর্তমানে জনির আশ্রয় দাতা পালিত মা এ প্রতিবেদককে জানান, তার স্বামির বক্তব্য ছিলো অনেকটা এমন, আমাদের সন্তান নেই, আল্লাহর ইচ্ছাতেই এক মেয়েকে লালন-পালন করছি। ওর রিজিক যদি আমার ঘরে থাকে তাহলে কারোরি কিছু করার নেই। ও আমাদের কাছেই থাকবে।” তখন থেকে জনির বাবা নামের বটবৃক্ষ ঐ মাজারের খাদেম আলি আকবার যা জনির জাতীয় পরিচয় পত্রে লিখা আছে। তখন থেকে মমতাময়ী হাসিনা বেগমের মাতৃস্নেহে মাজার লাগোয়া বাড়িতেই জনির শুরু হয় বেড়ে ওঠা।

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...