আজ ২রা বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৫ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

হোগলা পাতায় মজিদাদের লুকানো স্বপ্ন

শেখ আব্দুল জলিল


মজিদা বেগম,জান্নাত আক্তার,জাহেদা,আমেনা বেগম। সবারই বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই। স্বামী পরিত্যক্তা এইসব নারীরা নিজ বাড়িতে হোগলা পাতার কারুপণ্য তৈরী করে এখন স্বাবলম্বী। পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষন করে বাড়তি আয়ের টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করে বাড়ি তৈরী করার স্বপ্ন বুনছেন তারা।
উপজেলার বিন্নাবাইদ ইউনিয়নের জহুরীয়াকান্দা,চরকাসিমনগর,মেরাতলী,গোশালাকান্দাসহ বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে নজর কাটে হোগলা পাতার কারুপন্য। এ এলাকার প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ হোগলা পাতার কারুপণ্য তৈরীর দক্ষ কারিগর। এ এলাকার সৌখিন উপকরণ হোগলা পাতা দিয়ে তৈরী নানা পণ্য দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানী হচ্ছে ইউরোপ আমেরিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
দিনদিন এ শিল্পের চাহিদা ও কদর বৃদ্ধি পাওয়ায় ও হোগলা শিল্পের ব্যাপক প্রসারের জন্য বিন্নাবাইদ ইউনিয়নের চরকাসিমনগর নতুন বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে ইলমা শিল্পালয় ও হ্যান্ড্রিক্রাপট নামে একটি প্রতিষ্ঠান। জুহুরিয়াকান্দা গ্রামের যুবক শিপন মোল্লা গড়ে তুলেছেন এই কারখানা। এখানে কাজ করে বিন্নাবাইদ ইউনয়নের বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৩ হাজার নারী পুরুষ। এর মধ্যে বেশিরভাগই অসহায়,বিধবা,স্বামী পরিত্যক্তা,হতদরিদ্র ও প্রতিদ্বন্ধী নারী পুরুষ। তাদের হাতের তৈরী নজড়কাড়া হোগলা সামগ্রী এখন দেশ বিদেশের বাজারে বিশেষভাবে সমাদৃত।
সরেজমিনে বিন্নাবাইদ ইউনিয়নের চর কাশিমনগরম,মেরাতলী,জুহুরীয়াকান্দা গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি বাড়ির উঠান ও ঘরে শোভা পাচ্ছে হোগলা সামগ্রী ও হোগলা পাতার নানা পণ্য। কিশোর থেকে শুরু করে যুবক বৃদ্ধ ও গৃহবধুরাও ব্যস্ত সময় পাাড় করছেন হোগলা পণ্য তৈরীতে।

এ শিল্পের সাথে জড়িতদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,বরিশাল,নোয়াখালী ভোলাসহ সমুদ্র উপকুলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে হোগলা পাতা সংগ্রহ করে প্রথমে রোদে শুকিয়ে বিশেষ কায়দায় পেচিয়ে প্রথমে দড়ি তৈরী করেন কারিগররা। প্রতি এক হাজার হাত দড়ি তৈরীতে প্রায় ঘন্টা তিনেক সময় লাগে তাদের। পরে এই দড়ি থেকেই তৈরী হয় ফুল ফলের ঝুড়ি,ফ্লোর মেট,পাপস,ওয়াল মেট,টেবিল ম্যাট,ফুলের টপসহ দৃষ্টিনন্দিত নানা নামে প্রায় শতাধিক পণ্য।

চর কাশিমনগর নতুন বাজার এলাকায় ইলমা শিল্পালয় ও হ্যান্ডিক্রাপট কারখানায় গিয়ে দেখা যায়,সেখানে কাজ করছে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার নারী পুরুষ। এ কারখানার বেশিরভাগ শ্রমিকই নারী। এখানের হোগলা পাতার তৈরীকৃত পণ্য দেশ বিদেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করা হয়। পরিবেশ বান্ধব এসব পণ্যের এ কারখানার রয়েছে দেশ বিদেশের ডজন খানেক পাইকার। তাদের কাছেই বিক্রি করা হয় এ কারখানার তৈরী হোগলা পণ্য।

কারখানায় কাজ করা শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,এ এলাকার অধিকাংশ নারী পুরুষই হোগলা পণ্য তৈরীর সাথে জড়িত। গ্রামবাসির বেশিরভাগ বাসিন্দা কারখানা থেকে হোগলা উপকরণ নিয়ে মালিকের সাথে কন্ট্রাক করে নিজ বাড়িতে বসে বানাচ্ছেন পণ্যসামগ্রী। তারা সংসারের কাজের পাশাপাশি এ কাজটি করে মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন নিচ্ছেন। অন্যদিকে প্রায় তিন হাজার নারী পুরুষ সরাসরি বেতনের ভিত্তিতে শিপন মোল্লার কারখানাতেই কাজ করে মাসে আয় করছেন ১৫-২০ হাজার টাকা।

এ কারখানায় কাজ করা আংশিক শারিরীক প্রতিবন্ধী মোঃ রিয়াজ মিয়া ও রিপন মিয়া জানান,এ কারখানায় কাজ করে তারা এখন স্বাবলম্বী। প্রতিবন্ধী হওয়ায় আগে তাদের কেউ কাজে নিতনা। এ কারখানার মালিক তাদের কাজ করার সুযোগ দেয়ায় তাদের জীবনে স্বচ্ছলতা এসেছে। তাদের দেখাদেখি আরও অনেক নারী পুরুষ এ কারখানায় যুক্ত হতে শুরু করেছে।
কারখানায় কাজ করা নারী শ্রমিকদের মধ্যে মিম আক্তার,চাঁদনী,বকুলা বেগম,খালেদাসহ আরো অনেক শ্রমিক জানান,এক সময়ে নুন আন্তে পান্তা ফুরাতো তাদের। কয়েক মাস ধরে শিপন মোল্লার কারখানায় কাজ করার ফলে তাদের বেশ আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

ইলমা শিল্পালয় এন্ড হ্যান্ড্রিক্রাপট এর প্রোপাইটর মোঃ আমির হোসেন জানান,এ শিল্পটির প্রসার ঘটাতে বেশি পুঁজি বিনিয়োগের প্রয়োজন। যদি সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে তাহলে এ শিল্পে আরো উন্নয়ন হবে।

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোঃ শিপন মোল্লা জানান,নিজের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও এ এলাকার দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই এ কারখানার নির্মান করা। এ কারখানার উৎপাদিত বিভিন্ন সৌখিন পণ্যের মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের মানুষের কাছে তার নিজ উপজেলা বেলাবকে পরিচিত করে দেয়াও আরেকটি কারন। তিনি জানান,আমার এ কারখানা থেকে প্রতি মাসে সমুদয় খরচ বাদে আয় হয় প্রায় ১ থেকে দেড় লক্ষ টাকা।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা অনিক রায় বলেন,যদি তরুণ প্রজন্ম ও বেকার যুবকরা এ শিল্পের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করেন তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে আমি মনে করি।

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...