আজ ২৯শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১২ই এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

৬০ শহীদদের স্মৃতি বিজরীত রক্তস্নাত গ্রাম বেলাবরের বড়িবাড়ি

শেখ আব্দুল জলিল

কত বীভৎস দৃশ্য! কি ভয়াতুর মুহূর্ত!! পাখির মত গুলি করে ওরা মানষু মারছিল। নারী পুরুষ,বৃদ্ধ বৃদ্ধা,যুবক শিশু কেহই রেহায় পায়নি সেদিন পাক বাহিনীর নির্মম হত্যাকান্ড থেকে।

বাবা মায়ের সামনে সন্তানকে,ভাইয়ের সামনে বোনকে,স্ত্রীর সামনে স্বামীকে,স্বামীর সামনে স্ত্রীকে সেদিন তারা ব্রাশফায়ার করে হত্যা করছিল।

ঘাতকদের বুক একটুও কাঁপেনি সেদিন। লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গ্রামবাসিকে হত্যা করছিল সেদিন পাকবাহিনীরা।

এখনো মনে হলে ভয়ে বুক কেঁপে উঠে,চোখের জ্বলে বুক বুক ভাসে বড়িবাড়ি গ্রামের বৃদ্ধ আব্দুল জব্বারের।

শুধু আব্দুল জব্বার নয় বড়িবাড়ি ও এর আশেপাশের গ্রামের অনেকেই ১৯৭১ সালের স্থানীয় মুক্তিবাহিনীদের সাথে পাকবাহিনীর যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী নিরীহ গ্রামবাসির উপর হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দেন নরসিংদী পোস্টের কাছে।

বেলাব উপজেলার বাজনাব ইউনিয়নের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের শান্ত এক গ্রাম বড়িবাড়ি।

১৯৭১ সালের ১৪ জুলাই মঙ্গলবার সেই শান্ত গ্রামে হামলে পড়ে হায়েনার দল।

স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধাদের পরাজিত করে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ গ্রামবাসির উপর। মুহূমুহুূ গুলি আর বেয়নেট চার্জ করে একে একে হত্যা করে ০৫জন মুক্তিযোদ্ধা ও ৫৫জন গ্রামবাসিকে।

বহু বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় মানুষরুপি জানোয়ারগুলি।

বড়িবাড়ি গ্রামে লোমহর্ষক হত্যাকান্ড ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড চালিয়ে চলে যায় পাকবাহিনী। পাকবাহিনীরা চলে যাবার পর যদি আবার ফিরে এসে হত্যাকান্ড চালায় সেই ভয়ে বেঁচে থাকা অবশিষ্ঠ গ্রামবাসি এক কবরেই ৪/৫ জন করে দাফন করে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পাকবাহিনীর নির্মমতা ও হত্যাযজ্ঞের এক নীরব স্বাক্ষী ৭১ এর রক্তস্নাত গ্রাম বেলাবরের বড়িবাড়িতে প্রতি বছর ১৪ জুলাই দিনটি এলে স্বজন হারানোর কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়।

স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধা ও এলাকাবাসির সাথে কথা বলে জানা যায়,১৯৭১ সালের ১৪ জুলাই পাকবাহিনীর সাথে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধাদের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় এই বড়িবাড়িতে। সেই যুদ্ধে ৫ জন মুক্তিযুদ্ধা ও ৫৫ জন গ্রামবাসিকে হত্যা করে দখলদার বাহিনী। সেসময় অসংখ্য বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

কি ঘটেছিল সেদিন জানতে চাইলে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধারা জানান,১৯৭১ সালের ১৪ জুলাই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়,বেলাবতে পাকবাহিনী আসতে পারে। এমন খবরে ৩নং সেক্টরের অধীন প্লাটুন কমান্ডার সুবেদার আবুল বাশারের নের্তৃত্বে ২৫/২৬ জন মুক্তিযুদ্ধা বড়িবাড়ি গ্রামে অবস্থান নেয়।

১৪ জুলাই সকালে মুক্তিযুদ্ধারা দেখে কিশোরগঞ্জের সালুয়া গ্রাম থেকে কয়েকটি নৌকা ও লঞ্চ বেলাবরের দিকে এগিয়ে আসছে। এসময় বড়িবাড়িতে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সন্দেহ হলে নৌকাকে তীরে আসার নির্দেশ দেয়।

এ নির্দেশ শুনে নৌকা থেকে পাকবাহিনীরা মুক্তিযুদ্ধাদের উপর এলাপাথারী গুলি ছুড়তে থাকে।

অন্যদিকে লঞ্চে থাকা পাকবাহিনীর বিশাল আরেকটি দল কৌশলে তীরে উঠে মুক্তিবাহিনীদের ঘিরে ফেলে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। কিন্তু ভারী অস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীর শতাধিক সদস্যর সাথে যুদ্ধে পেরে উঠতে না পেরে মুক্তিযুদ্ধারা পিছু হটতে থাকে। পরাজয় হয় মুক্তিযুদ্ধাদের। যুদ্ধে শহীদ হয় প্লাটুন কমান্ডার সুবেদার আবুল বাশার বীর প্রতিক,আব্দুল বারি,নূরুল হক,মমতাজ উদ্দীন ও সোহরাব হোসেন নামের ০৫ জন মুক্তিযুদ্ধা।

পরে পাকবাহিনীরা বড়িবাড়ি গ্রামে ঢুকে নির্মমভাবে ৫৫ জন গ্রামবাসিকে হত্যা করে।

বড়িবাড়ির যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযুদ্ধা খলিলউল্লাহ পাঠান বলেন,বড়িবাড়ি যুদ্ধে শহীদ হওয়া ০৫জন মুক্তিযুদ্ধা ও ৫৫ জন গ্রামবাসির একটি নামফলক এখানে নির্মান করা উচিত। যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এই নামফলক দেখে জানতে পারে এ যুদ্ধে কারা কারা শহীদ হয়ছিল।

কলেজ শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেদাউস,হৃদয় আহমেদ বলেন,আমরা চাই বড়িবাড়ি যুদ্ধে যেসব মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসি শহীদ হয়েছে তাদের নামফলক এখানে নির্মান করা হোক। যাতে আমরা নামফলক দেখেই জানতে পারি ১৯৭১ সালের ১৪ জুলাই বড়িবাড়ি এলাকায় সংঘঠিত যুদ্ধে কারা কারা শহীদ হয়েছিল।

বেলাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আক্তার হোসেন শাহীন বলেন,ইতিমধ্যে গণপূর্ত বিভাগের কাছে জমি অধিগ্রহণের জন্য কাগজ পত্র পাঠানো হয়েছে। এখানে যে গণকবর সেটা সংরক্ষণ খুব তারাতারিই হবে। আমরা বড়িবাড়ির গণকবর সংরক্ষণ ও নাম ফলকের কাজ খুব শ্রীঘ্রই শুরু করবো।

এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরির আরো নিউজ...